রোহিঙ্গা সংকট: বাংলাদেশের চাওয়া ও ভারতের অবস্থান”

মাটিন নিউজ ডেক্স:

সাম্প্রতিক কালের বর্বরোচিত জাতিগত নিধনের সাক্ষী মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। অমানবিক নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে সারা বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বভ্রম্মান্ড মানবতার এই নেত্রীকে ‘মাদার অব হিউমিনিটি’ সম্মানে ভূষিত করেছে। বাংলাদেশের বহুবিধ সমস্যার মধ্যেও প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয় এবং ভরণ-পোষণ নিঃসন্দেহে এক সাহসী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ আজ বিশ্ব শান্তির ‘রোল মডেল’।

এদিকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার গুটি এখন ‘রোহিঙ্গা ইস্যু’। প্রত্যকেই তার নিজ জায়গা থেকে রোহিঙ্গা নিয়ে রাজনীতি করছে। রাজনৈতিক খেলার এক মোক্ষম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোন দেশের কী অবস্থান তা নিয়ে চলছে নিখুঁত বিশ্লেষণ। মিয়ানমার যেহেতু চীন, ভারত ও কিছুটা রাশিয়া বলয়ের তাই বিশ্বের শক্তিধর এই তিনটি দেশের অবস্থান নিয়ে সবার আগ্রহ। তবে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু যতোটা না চীন রাশিয়া নিয়ে তার চাইতে বেশি ভারতকে নিয়ে। জনমনে অনেক প্রশ্ন ভারতের অবস্থান নিয়ে। ভারত কি হিসেবে দেখছে রোহিঙ্গা সমস্যাকে? আদৌ কি ভারত বাংলাদেশের পাশে আছে? জাতিসংঘের এক বৈঠকে কেনোইবা ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভোট দানে বিরত রইলো? এমন অনেক প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসেব নিকেশের পাঠ নিতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ ভারত যেমন বাংলাদেশের আন্তরিক বন্ধু, তেমনি মিয়ানমারের ওপরও ভারতের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তবে ভারত চাইলেই তা একদিনে সমাধান করে দেয়া সম্ভব, এই ধারণা পোষণ করা উচিত নয়। ভারত তার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা নিয়েই এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কেননা সর্বশেষ জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ৩৬তম অধিবেশনে ভারত সুস্পষ্টভাবে ‘কফি আনান কমিশন’-এর সুপারিশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংকটের সমাধান চেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বার বার ‘কফি আনান কমিশন’ এর সুপারিশ বাস্তবায়নের দিকে আলোকপাত করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনেও এই সুপারিশের পক্ষে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বশক্তিকে আহবান জানিয়েছেন। ভারত সরকার ‘জেনেভা কনভেনশন’এ বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে যেখানে চীন, রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করেছে। তাই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ভারত সঠিক অবস্থানেই আছে, এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এই সংকট সমাধানে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে ভারত অবশ্যই তার জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে- এটাই স্বাভাবিক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ভারত সফরেও মোদী-হাসিনা বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু এসেছে যা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছে দুই দেশ। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, জাতিসংঘের এক বৈঠকে যখন রোহিঙ্গা ইস্যু উত্থাপিত হলো তখন ভারত কেনো ভোট দানে বিরত থেকেছিলো? প্রশ্নটি শুনে যে কারো মনে হতে পারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদের কোন গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নির্ধারণের মিটিং ছিলো এটি। কিন্তু না, সেটি ছিলো জাতিসংঘের এজেন্ডা নির্ধারণের একটি বৈঠক যেখানে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে ভোটাভুটির আয়োজন করার জন্য প্রস্তাব আনে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জোট ‘ওআইসি’।মূলত ওআইসি’র আহবানে জাতিসংঘের এক বৈঠকে এই ভোট হয়। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযান বন্ধে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে আহবান জানানো হয়। সেই সাথে দেশ থেকে বিতাড়িত ও বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার এবং তাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। তাই কৌতূহল জাগতেই পারে যে, উপরোক্ত এজেন্ডাগুলো নিয়েই তো ভারত ‘জেনেভা কনভেনশন’-এ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চেয়েছেন এবং বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তবে হঠাৎ করেই কেনো এ বৈঠকে ভোট দানে বিরত থাকবে ভারত?

এর যৌক্তিক উত্তর খুঁজে বের করতে হলে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। ভারত-ওআইসি সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে হবে। ভারত-ওআইসি সম্পর্ক কখনোই খুব একটা সুখকর ছিলোনা। পাকিস্তানের কারণেই মূলত ভারতের সাথে ওআইসি’র দূরত্ব বাড়ে। জম্মু-কাশ্মির ইস্যুতে ভারতকে আঘাত করার জন্য পাকিস্তান ওআইসিকে বরাবরই একটা উপযুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং এখনো করছে। ‘ওআইসি’র পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে যতোবার ভারতের নাম এসেছে ততোবার বিরোধীতা করেছে পাকিস্তান। ওআইসি’র পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের তালিকায় রাশিয়া, থাইল্যান্ড, নর্দান সাইপ্রাস, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং বসনিয়া হারজেগোভিনার নাম থাকলেও প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের আবাস হওয়া সত্ত্বেও ভারতের নাম সেখানে নেই।

২০০৬ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ আবদুল্লাহ ভারতকে ওআইসির পর্যবেক্ষক করার প্রস্তাব দিলেও পাকিস্তানের বিরোধীতার কারণে তা কার্যকর হয়নি। অবশেষে এ বছর ৬ মে ঢাকায় ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে ওআইসি’র পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের তালিকায় আনার দাবি তোলা হয় এবং এবারো যথারীতি বিরোধীতা করে পাকিস্তান। এসব কারণেই ভারত-ওআইসি সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই বৈরী। তাই ‘ওআইসি’ কর্তৃক কোন বিলকে ভারত সর্বদা অসম্মতিই দিয়ে এসেছে, কিন্তু এবার এই উপরোক্ত বৈঠকে অসম্মতি জানায়নি ভারত বরং ভোটদানে বিরত থেকেছে। ভোটদানে বিরত থাকা আর বিরুদ্ধে ভোট দেয়া এই দু’য়ের পার্থক্য জানতে হবে আগে। অনেক মিডিয়া দেখেছি তখন রিপোর্ট করেছে এই শিরোনামে, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ভারত’। অনেক মিডিয়ার এই অসত্য অবস্থান জনমনে বিভ্রান্তি তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। ওআইসি’র উত্থাপিত বিলে ভারত ওআইসি’র বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে ভোটদানে বিরত থাকা সত্যি এক বিরল ঘটনা, আর তা কেবলমাত্র সম্ভব হয়েছে দু’দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণেই। আবার এই ভোটাভুটির প্রস্তাব ওআইসি’র মাধ্যমে উত্থাপন এক আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ যেখানে ভারতকে দমিয়ে রাখতে পাকিস্তান তার সর্বোচ্চ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে ওআইসি’র মাধ্যমে। পাকিস্তান ভালো করেই জানতো ওআইসি’র মাধ্যমে উত্থাপিত বিলে ভারত এর বিরুদ্ধে ভোট দেবে। কিন্তু ভারত বিরুদ্ধে ভোট না দিয়ে ভোট দানেই বিরত থেকেছে তাই পাকিস্তান তার দাবার চালে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন রোহিঙ্গা কেন্দ্রিক এবং প্রত্যেকেই তার নিজ জায়গা থেকে এটা নিয়ে খেলছে। তাছাড়া আমাদেরও একটা সহজ সমীকরণ বুঝা দরকার, যে ভারত জেনেভা কনভেনশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ‘কফি আনান কমিশন’ বাস্তবায়নের দাবী জানিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে তার অবস্থান জানান দিয়েছে, সেই ভারত একই প্রস্তাবে বিরোধীতা করার কোন মানে নেই। বিরোধীতা করা মানে নিজের অবস্থানকে নিজে অস্বীকারের শামিল! তাই এই বৈঠকে ভোটদানে বিরত থাকা নিয়ে যারা ভারত বিরোধী প্রোপাগান্ডাতে লিপ্ত তারা কিন্ত চীন বা রাশিয়া নিয়ে চুপ। অথচ সেই বৈঠকে চীন, রাশিয়া সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ভারত যেখানে ‘চেক অফ ব্যালেন্স’ নীতি অনুসরণ করলো সেখানে চীন সরাসরি বিরোধীতা করলো। তারপরেও একদল প্রশ্নবিদ্ধ করলো ভারতকে , চীন বা রাশিয়াকে না।

আবার গত বছর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সিপিএ সম্মেলনেও ভারত বাংলাদেশের পক্ষে তার স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ৫-৭ নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৬৩তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন-সিপিএ’র সম্মেলনে সিপিএভুক্ত ৫২টি দেশের মধ্যে ৪৪টি দেশের ১১০টি ব্রাঞ্চের জনপ্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। এবারের সিপিএ সম্মেলনের নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি না থাকলেও বাংলাদেশ এটা আলোচনায় এনেছে। কারণ বাংলাদেশ চেয়েছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সিপিএ’র মাধ্যমে সংসদীয় কূটনীতি জোরদার করতে। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে অবস্থান নিয়ে মিয়ানমারকে তাদের দেশের নাগরিকদের উপর বর্বরতার নিন্দা জানিয়েছেন। অনেকেই এই বর্বরতাকে গণহত্যা বলেও আখ্যায়িত করেছেন। সিপিএ সম্মেলনে ভারত সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

ভারতের লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন মিয়ানমারের সমালোচনা করে এই সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারকেই এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘসহ বিশ্বের সবগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন।

ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের কিছুটা দ্বিধান্বিত নীতি বিদ্যমান। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকে দমন করার জন্য সামরিক জান্তার সমালোচনা করে ভারত। এ কারণে বছরের পর বছর ধরে ওই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব বজায় ছিল।

অপরদিকে চীন মিয়ানমার সম্পর্ক অনেক দিক থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এ পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে বিনিয়োগ করছে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীকে নাখোশ করাটাকে মিয়ানমারের কৌশলগত ভুল বলে বিবেচনা করে এসেছে ভারত। আর তাই ২০১৪ সালে মোদী সরকার এসে নতুন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকেই নজর দিয়েছে বেশি। তাছাড়া বঙ্গোপসাগর থেকে চীনকে দূরে রাখা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষেত্রে মিয়ানমারের গুরুত্ব রয়েছে। সে গুরুত্ব থেকেও ভারত সরাসরি রোহিঙ্গা ইস্যুতে না জড়ানোটা স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু ভারত অবাক করে দিয়ে এক্ষেত্রে সরব ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে জেনেভা কনভেনশন ও সিপিএ সম্মেলনে জোরালো ভূমিকা পালন করেছে।

অন্যদিক থেকে ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থকেও জলাঞ্জলি দিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ভারত সরকার।

২০১৫ সালের একটি আলোচিত ঘটনা দিয়েই নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরছি। ২০১৫ সালে মণিপুরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বহরের ওপর নাগা বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর ভারতীয় বাহিনী ইয়াঙ্গুনের নীরব সম্মতিতে মিয়ানমারের সীমান্তে গোপন অভিযান চালায়। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরাসরি মিয়ানমার বাহিনীকে প্রচ্ছন্নভাবে ব্যবহার করে অভিযান চালানো নিঃসন্দেহে দু’দেশের নিরাপত্তা সমঝোতার এক বিরল ঘটনা। তাই ওই সমঝোতা ক্ষতিগ্রস্ত হোক ভারত নিশ্চয়ই তা চাইবে না। কিন্তু মিয়ানমারের সাথে নিরাপত্তাসহ আঞ্চলিক মৈত্রীর সব সমীকরণ ভুলে গিয়ে দিল্লী রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরব না থেকে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, তবে সেটা অবশ্যই ‘চেক অফ ব্যালেন্স’ নীতি অনুসরণ করে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ভারসাম্যমূলক নীতির বাইরে গিয়ে মুহুর্তেই পরিপূর্ণ সমাধান দেবে বলে যদি আমরা ধারণা পোষণ করি, তবে সেটা হবে একদম আশায় গুড়ে বালি! কারণ এই রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির অংশ। এর সমাধান একা ভারতের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয় বরং চীনের অধিক প্রভাব রয়েছে মিয়ানমারের উপর। কিন্তু ভারত যেখানে সরাসরি বাংলাদেশের সাথে আছে চীন সেখানে মিয়ানমারের এই গণহত্যাকে দিনের পর দিন সমর্থনই দিয়ে যাচ্ছে। তাই ভারতের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে বরং রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই সাহসী অবস্থানকে প্রশংসা করা উচিত।

অনেকেই মনে করে থাকেন, রোহিঙ্গা সমস্যা কেবলই বাংলাদেশের, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বর্তমানে দৃশ্যমান সমস্যায় বাংলাদেশ পরলেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে সুদূরপ্রসারী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভারত। কেননা বাংলাদেশের রোহিঙ্গা স্রোত একসময় আছড়ে পরবে ভারতেও। রোহিঙ্গাদের সামনে রেখে ভারতে চরমপন্থা মাথাছাড়া দিয়ে উঠার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া ২০ লাখেরও বেশি রাষ্ট্রবিহীন পৃথিবীর বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী যদি তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে না পায়, একটা সময় তারা সন্ত্রাসবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। যার ফল ভোগ করতে হবে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রসমূহকে। অধিকারহারা জনগোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরার নজিড় গোটা বিশ্বেই বিদ্যমান। তাছাড়া ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের উর্বর ভূমি এই অঞ্চল সেটা ভুলে গেলেও চলবে না। ফলে এই অঞ্চলে দ্রুত সময়ের যদি মধ্যে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হয় তাহলে তৈরি হতে পারে ধর্মীয় সহিংসতার। যার প্রভাব পরবে ব্যবসা বাণিজ্যসহ সর্বক্ষেত্রে। ভূ-রাজনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে যার কুফল এর আগেও প্রত্যক্ষ করেছে ভারত। কেননা ১৯৯১-১৯৯২ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলে ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে থাকা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার একটা বড় অংশও এই সন্ত্রাসী কাজে নিজেদের জড়ায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। শেখ হাসিনা সরকার কঠোর হাতে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা যেমন ভারত সরকার ভুলেনি ঠিক তেমনি ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান যে মিয়ানমারের উপরে আর মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে যে ভারত নয় বরং চীন অধিক উপরে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ভারত এই ব্যাপারে বাংলাদেশের পাশে না থেকে মিয়ানমারের পাশে থাকবে সেটার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ‘চেক অফ ব্যালেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এটা তাদের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি। কারো সাথে শত্রুতা করে কোন সমস্যার সমাধানে ভারত না এগিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সেটার সমাধান তারা করতে চাইছে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কূটনীতির ক্ষেত্রে কিছু আলাদা কৌশল থাকে, থাকে নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কূটনীতিতে প্রত্যেক দেশের নিজস্ব স্বার্থের গুরুত্ব থাকে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের নিজস্ব সম্পর্ক রয়েছে, একইভাবে বাংলাদেশের সঙ্গেও ভারতের নিজস্ব সম্পর্ক রয়েছে। ভারতের কাছে উভয় সম্পর্কেরই পৃথকভাবে গুরুত্ব রয়েছে। সেই গুরুত্বকে সামনে রেখেই ভারত তার কূটনীতি চালিয়ে যাবে। কারণ ভারত বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার উভয় দেশকেই খুব ভালো বন্ধু হিসেবে দেখে। দু’দেশের সঙ্গেই ভারতের আলাদা সম্পর্ক বিরাজমান। সে কারণে ভারত যেমন জেনেভা কনভেনশনে রাখাইন রাজ্যের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উম্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তেমনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্যও সবার আগে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ভারত জেনেভা কনভেনশনে কফি আনান কমিশনের বাস্তবায়ন চেয়েছে। আবারো বলছি, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ভারতের একার বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতির অংশ। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক নানা পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। সেসব আলোচনায় ভারত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই ভূমিকা রাখছে। ভারতের পরিস্কার অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বাংলাদেশ এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। ভারতকে সাথে নিয়েই এই সমস্যা সমাধান করার পথে হাঁটতে হবে বাংলাদেশকে। এই পথচলায় বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু ভারতকে আমরা পাবো বন্ধুর ভূমিকায়, এই আমাদের প্রত্যাশা।

বিডি-প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*