থানা ভীতি নয়,বরং বিড়ম্বনা এড়াতে যা করবেন

 

শাহরিয়ার মাহমুদ নয়ন = আজকের এই লিখাটি যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার থানায় হয়রানির শিকার হয়েছেন বা হন তাদের জন্য এবং এই লিখাটি সবার জন্য সতর্কীকরণ নয় বরং সজাগ হবার চেতনা বিশেষ। দেশের ৮৫% মানুষ আইন সম্পর্কে অন্ধকারে বিধায় অপরাধ বেশি করে,আর আইনের অপপ্রয়োগ করে।

অন্যদিকে আইন বিষয়ে অজ্ঞ থাকার কারণে অনেকেই হয়রানির শিকার হয় থানা বা কোর্টে। আমি থানার বিষয়টি উল্লেখ করার চেষ্টা করছি। অজ্ঞ মানুষেরা থানার বারান্দায় গিয়ে কি করবে বা কি করবে না তা নিয়ে খুবই টেনশনে থাকে। তারা অনেকেই থানার ভিতরে যাওয়ার সাহস পায়না। যার ফলে তারা দালাল চক্রে কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শে এসে যায় এবং এই চক্র সমূহ এই অজ্ঞ লোকদের কাছ থেকে কৌশলে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়।

এবার থানার অভ্যন্তরীন বিষয়ে আলাপ করা যাক। থানায় যখন আপনি যাবেন তখন সর্বনিম্ন চারটি বড় বড় কক্ষ দেখতে পাবেন। তাদের মধ্যে একটি হল অভিযোগ কক্ষ। সাধারণত কোন অভিযোগ কিংবা সাধারণ ডায়েরি অথবা জেনারেল ডায়েরি (জি.ডি.) এই কক্ষে দায়ের করা হয়ে থাকে। তারপরের কক্ষটি হল ইনভেষ্টিগেশন অফিসারদের কক্ষ যাদের এস. আই. বলা হয়।

এই কক্ষে ঢুকলে দেখবেন তাদের টেবিল গুলো ছোট ছোট আকারে বসানো হয়েছে। আপনার যদি থানায় কোন কিছুর পরামর্শের দরকার হয়, তাহলে তাদের বরাবরে আপনার মূল্যবান বক্তব্য পেশ করুন। তার পরের কক্ষটি হল সেকেন্ড অফিসারের কক্ষ। কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার পর সেখানকার জেলে ঢুকিয়ে তাদের নির্দিষ্ট খাতায় ঐ ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং অপরাধের ধরণ লিপিবদ্ধ করা হয়ে থাকে। থানার অফিসার ইনচার্জ বা ও.সি.’র পরেই সেকেন্ড অফিসারের স্থান।

অফিসার ইনচার্জের অবর্তমানে সেকেন্ড অফিসার থানার যাবতীয় কর্মকান্ড সমূহ তদারকি করে থাকেন। তার পরের কক্ষটি হল অফিসার ইনচার্জ বা ও.সি.’র কক্ষ। সম্ভাব্য অপরাধ কিংবা অপরাধ সংক্রান্ত প্রতিকার কিংবা অপরাধের বিভিন্ন তথ্যাবলির বিবরণ দরখাস্ত আকারে আপনি তাঁর বরাবরে পেশ করতে পারেন।

এখন বাস্তবতায় আসা যাক। মনে রাখবেন কাউকে গ্রেফতার করার পর যতক্ষন না তার অপরাধ আদালতে প্রমাণ হচ্ছে ততক্ষন সে অপরাধী হিসেবে গণ্য হবে না। চট্রগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শ্রদ্ধেয় একজন শিক্ষাগুরু বলে গেছেন,কখনো কোন পুলিশ বা অন্য কোন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোন কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করবেন না।

ভেবে দেখুন তাদের কোন একজনকে যদি এই ‘স্যার’ শব্দটি দিয়ে সম্বোধন করেন তাহেলে তারা নিজেদের মনে মনে পুলিশ সুপার কিংবা কোন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা বলে মনে করেন। তাদেরকে ভাইয়া কিংবা খালু বলে সবসময় সম্বোধন করবেন।

মূলত এস আই কর্তৃক গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে থানার হাজতে বন্দী করার পর তার সম্পর্কে কিংবা তাকে কি কারণে গ্রফতার করানো হয়েছে তা থানার অভিযোগ কক্ষের নির্দিষ্ট খাতা লিপিবদ্ধ করানো হয়ে থাকে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পরিবারের যে কোন সদস্যকে থানায় ডাকা হয়। মনে রাখবেন ঐ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার পর একজন এস আই এর কাজ আপাতত এখানেই শেষ।

তারপর গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে সেকেন্ড অফিসার। আলোচনা সাপেক্ষে যদি ঐ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়ার কোন সুযোগ থাকে তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে কিংবা যদি সুযোগ না থাকে তাহলে ছেড়ে না দিয়ে তার বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করে।

এজাহারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, অপরাধের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির ১৮৬০ এর ধারা সমূহ পেশ করা হয়। তারপর তাকে জেলার জেল কারাগারে চালান করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে এই এজাহার জি আর মামলা হয়ে কোর্টে পাঠানো হয়।

থানায় কেউ গ্রেফতার হয়ে থাকলে করনীয়ঃ

১। প্রথমে আপনি দালাল চক্রের সাহায্য ছাড়া সরাসরে থানায় গিয়ে অভিযোগ কক্ষে আপনার পরিচয় দিয়ে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করুন এবং কোন এস আই এর মাধ্যমে তাকে গ্রেফতার করানো হয়েছে তা জেনে নিন।

২। তারপর এস আই সাহেবের সাথে কৌশলে কিংবা আপনার বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন। তার সামনে ভয়ের সুরে কথা বলবেন না। পর্যাপ্ত সাহসের সাথে তার কাছ থেকে গ্রেফতারের কারণ জেনে নিন। কি কারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

৩। আপনার সাথে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তির সাথে ভাল পরিচয় থাকলে তাকে গ্রেফতারের কারণ অবগত করে ঐ এস আই এর সাথে কিংবা অফিসার ইনসার্জের সাথে যোগাযোগ করতে বলুন।

৪। হয়রানির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আপনার উপর নির্ভর করে। আপনি থানার নিয়ম কানুন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলে হয়রানির শিকার হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। মনে রাখবেন যারা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদেরকে কোন পুলিশই ভাল চোখে দেখেন না। আপনার সমস্যার মোকাবেলা করতে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন করুন যিনি জনগণের কাছে সম্মানি লোক।

৫। যদি আপনি শিক্ষানবীশ কিংবা একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে অথবা তাঁকে সাথে করে থানায় নিয়ে গেলে আপনার সমস্যা ইনশাল্লাহ সমাধান হয়ে যাবে। তবে এই নয় যে,আমাদের ব্যবসা ঠিক করছি।মানুষের জন্য মানুষ তবে কিছু ভালো মানুষের জন্যই তো আজকের পৃথিবীর বসবাস।

শাহরিয়ার মাহমুদ (নয়ন), শিক্ষানবীশ আইনজীবী,
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, কক্সবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*